মাথা ব্যথার কারণ সমূহঃ

বিভিন্ন কারণে মাথা ব্যাথা হতে পারে এবং এর জন্য বিভিন্ন সমাধানও রয়েছে। নিচে কিছু কারণ সমূহ ব্যাখ্যা করা হলো।


কয়েকটি সাধারণ প্রকারের মাথাব্যথা এবং তাদের উপসর্গগুলি হল:

  • মাইগ্রেন
    মাইগ্রেন বংশগত রোগ। মাইগ্রেন হওয়ার আগে একটি সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিবর্তনযোগ্য স্নায়বিক উপসর্গ দেখা দেয় যা চাক্ষুষ দেখা যায় বা অনুভব করা যায়। মাথাব্যথা ধীরে ধীর বাড়তে থাকে; তারপর কমতে থাকে - যাকে 'অরা' বলা হয়। এইগুলি আরও চিহ্নিত করা হয় বিভিন্ন মাত্রার পুনরাবৃত্ত মাথাব্যথা দিয়ে, আলোর প্রতি সংবেদনশীলতা দিয়ে, ঘুমের বিঘ্নের ধরণ দিয়ে এবং মানসিক অবসাদ দিয়ে।
     
  • টেনশানের মতন মাথাব্যথা
    এটি মাথাব্যথার একটি খুব সাধারণ রূপ, যা জীবনকালের প্রায় 80% সময়েই থাকে। এই নিস্তেজ মাথাব্যথা সাধারণত মাথার দুই দিকেই হয়। এদের তীব্রতা খুব কম থেকে মাঝামাঝি। এই মাথাব্যথা মাঝে মাঝে, ঘন ঘন, বা দীর্ঘস্থায়ী হয়।
     
  • ক্লাস্টার মাথাব্যথা
    ক্লাস্টার মাথাব্যথা হঠাৎ শুরু হয়। মুখমণ্ডলের মধ্য ও উপরের ভাগ এবং চোখের চারপাশে এই ব্যথা হয়। দিনে 1-8 বার এই ব্যথা হয় এবং চলে সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস পর্যন্ত। মাঝে মাঝে ব্যথা একদম থাকে না। এই ব্যথা না থাকার কাল কয়েক মাস থেকে কয়েক বছর হতে পারে। এই জ্বালা ধরানো ব্যথা হঠাৎ হয় এবং 15 মিনিট থেকে 3 ঘণ্টা অবধি স্থায়ী হয়। কখনও এই ব্যথা 24 ঘণ্টা বাদে বাদে হয় - তাই একে 'এলার্ম ঘড়ি মাথাব্যথা' বলা হয়। এই ব্যথা হলে চোখে জল আসে, নাক বন্ধ হয়ে যায় এবং অনিদ্রা হয়।
     
  • সাইনাস মাথাব্যথা
    এই ব্যথার সাধারণ লক্ষণগুলি হল মুখমণ্ডলে ব্যথা বা চাপ ভাব, বন্ধ নাক এবং সাইনাস এবং তার সাথে মাথাব্যথা। ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণের পর সাধারণত এই ব্যথা দেখা যায়। এর সাথে নাক থেকে ঘন সর্দি পড়ে, গন্ধের অনুভূতি কমে যায় বা একেবারে থাকে না, মুখমণ্ডলে ব্যথা-চাপ এবং জ্বর হয়। এন্টিবায়োটিক নিলে এক সপ্তাহের মধ্য এই অসুখ সেরে যায়।
     
  • বজ্রপাত-এর মত মাথাব্যথা
    এই  গুরুতর এবং তীব্র ব্যথা শুরু হয় হঠাৎ বা ধীরে ধীরে। এটি মুখ্য বা গৌণ হতে পারে। গৌণ কারণগুলি হতে পারে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ, মস্তিষ্কের চাপ হটাৎ কমে যাওয়া এবং রক্ত-চাপ বেড়ে যাওয়া।
     
  • নতুন দৈনিক স্থায়ী মাথা ব্যাথা
    এটি একটি স্থায়ী মাথা ব্যথা যা রোজ হয় এবং যা পরিষ্কার মনে থাকে। এই ব্যথার কোন বৈশিষ্ঠ নেই। এটি মাইগ্রেন বা টেনশান মাথাব্যথার মত। 3 মাস বা তার বেশি সময় ধরে এর উপসর্গ থাকলে তবেই একে নির্ণয় করা যায়।
     
  • হেমিক্র্যানিয়া কনটিনিউয়া
    এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী রোগ যা প্রতিদিন হয়। এটি হয় মাথার একদিকে এবং এর তীব্রতা মাঝারি ধরণের। এই মাথাব্যথার সাথে চোখ লাল হয়ে যায় এবং ছলছল করে, নাক বন্ধ হয়ে যায় বা সর্দি হয়। চোখের পাতা ঢলে পড়ে যেমন ক্লাস্টার মাথাব্যথায় হয়।
  • গৌণ মাথাব্যথা
    যখন একটি মাথাব্যথা কোন মুখ্য শ্রেণির মধ্যে পড়ে না, কিন্তু পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে থাকে, তখনই সাবধান হতে হবে এবং এর অন্তর্নিহিত কারণটিকে খুঁজে বার করতে হবে। গৌণ মাথাব্যথাগুলির কোনও বৈশিষ্ঠ থাকে না।

 

  • চক্ষুজনিত মাথা ব্যথা

শতকরা ৫ ভাগ মাথা ব্যথা চক্ষুজনিত। চোখের দৃষ্টিশক্তি কম থাকলে মাথা ব্যথা হতে পারে। অনেকক্ষণ পড়াশুনা করা, সেলাই করা, সিনেমা দেখা বা কম্পিউটার স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকলেও মাথা ব্যথা হতে পারে। চোখের কোন রোগ যেমন- কর্ণিয়া, আইরিশের প্রদাহ, গ্লুকোমা বা রেট্রোবালবার নিউরাইটিস ইত্যাদি কারণেও মাথা ব্যথা হতে পারে। চক্ষুজনিত মাথা ব্যথা সাধারণত: চোখে, কপালের দু’দিকে বা মাথার পিছনে হয়ে থাকে। চক্ষুজনিত মাথা ব্যথায় চক্ষু বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।

 

  • হরমোনজনিত মাথা ব্যথা

মহিলাদের মাসিক কালীন সময়ে প্রোজেষ্টেরন ও এষ্ট্রোজেন হরমোনের উঠানামার কারণে মাথা ব্যথা হতে পারে। জন্ম নিয়ন্ত্রণ বড়ি খেলেও মাথা ব্যথা হতে পারে। মাসিক চক্র শেষ হলে বা জন্ম নিয়ন্ত্রণ বড়ি খাওয়া বন্ধ করলে এ ধরণের মাথা ব্যথা ভাল হয়ে যায়।

 

মাথা ব্যথার চিকিৎসা

যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে চিকিৎসা শুরু করাই হল অবস্থার মোকাবিলা করার সর্বোত্তম রাস্তা। উপসর্গগুলি পরীক্ষা করে ডাক্তারনিচের যে কোন একটি চিকিৎসা ব্যবস্থার সুপারিশ করতে পারেন:

স্বশিক্ষিত হোন 
সফল চিকিৎসার একটি চাবিকাঠি হল মাথাব্যথার ধরণ সম্পর্কে নিজেকে শিক্ষিত করে তোলা। আপনার ডাক্তারআপনাকে মাথাব্যথার একটি ডায়েরি দিয়ে রোগের বিস্তারিত বিবরণ লিখে রাখতে বলতে পারেন। তাতে এও লিখবেন যে কি কারণে মাথাব্যথা শুরু হল, আরাম পাওয়ার জন্য কি কি করেছেন, এবং আর কি কি বিশিষ্ঠ ঘটনা ঘটেছে।

চাপ নিয়ন্ত্রণ 
আগে যেমন বলা হয়েছে যে আজকের যুগে মাথাব্যথা শুরু হওয়ার সব চেয়ে সাধারণ কারণ হল চাপ। আপনার ডাক্তারচাপ হ্রাস করার করার কার্যকরী পদ্ধতিগুলি সুপারিশ করতে পারেন যেমন যোগ ব্যায়াম, ধ্যান, গভীর শ্বাস-প্রশ্বাসে ব্যায়াম, সুগন্ধ দিয়ে চিকিৎসা, সঙ্গীতের মাধ্যমে চিকিৎসা অথবা পোষা প্রাণী নিয়ে চিকিৎসা।

ওষুধের জন্য আপনার ডাক্তারকে জিজ্ঞাসা করুন
যদি উপসর্গগুলি খুবই তীব্র হয় বা দীর্ঘস্থায়ী হয় তাহলে আপনার ডাক্তারওষুধের বিধান দিতে পারেন। সাধারণত এই ওষুধগুলিকে তিনটি শ্রেণীতে ভাগ করা যায়:

  • উপসর্গ অনুযায়ী ওষুধ
    এইগুলি খুবই সহজ বাজার চলতি ওষুধ, যেমন প্যারাসিটামল, এসপিরিন বা ইবুপ্রোফেন। তবে মনে রাখতে হবে অধিক মাত্রায় ওষুধ ভাল'র চেয়ে খারাপ বেশি করতে পারে। কাজেই সব চেয়ে ভাল হল ডাক্তারের কাছ থেকে এইগুলির নিরাপত্তার তথ্যগুলি জেনে নেওয়া।
     
  • ব্যর্থকারী ওষুধ 
    নাম থেকেই বোঝা যাচ্ছে যে মাথাব্যথার প্রথম লক্ষণগুলি দেখা দিলেই এই ওষুধগুলি ব্যথার বৃদ্ধিকে বাধা দেয়। এই ধরণের ওষুধের মধ্যে আছে ইনজেকশান দেওয়ার জন্য এরগোটামিন এবং সুমাট্রিপিন। তবে এইগুলি কিনতে হলে ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন প্রয়োজন হবে।
     
  • প্রতিরোধকারী ওষুধ
    মাথাব্যথা যদি খুব তীব্র হয় বা বারে বারে হতে থাকে, তাহলে এই ওষুধগুলি ব্যবহার করা হয়। এদের মধ্যে আছে এন্টিডিপ্রেসান্ট, যেমন এমিট্রিপটাইলিন; ক্যালসিয়াম চ্যানেল ব্লকারস, যেমন এমলোডিপিন; এন্টিহিস্টামিনস, যেমন ফেনিরামিন; এবং এন্টিকনভালস্যানটস, যেমন ভালপ্রোয়েট। এইগুলি ডাক্তারপ্রেসক্রাইব করবেন এবং সাবধানে ব্যবহার করতে হবে।

বিকল্প চিকিৎসা পদ্ধতি চেষ্টা করুন 
নতুন নতুন চিকিৎসা পদ্ধতি আছে। সাধারণত প্রথাগত চিকিৎসার সাথে সাথে অথবা তার প্রভাব বৃদ্ধি করতে এই বিকল্প চিকিৎসা পদ্ধতি ব্যবহার হয়। এদের মধ্যে আছে:

  • আকুপাঙ্কচার
  • মস্তিষ্কের গভীরে উদ্দীপনা সৃষ্টি
  • বায়োফিডব্যাক
  • পেশির প্রগতিশীল শিথিলকরণ
  • পরামর্শ-সূচক চিকিৎসা

জীবনধারার পরিবর্তন

  • যেহেতু মাথাব্যথা খুব সাধারণভাবে জীবনধারা এবং অভ্যাসের সাথে সম্প্রীত, তাই মাথাব্যথা না হতে দেওয়ার সর্বোত্তম উপায় হল জীবনধারাতে ছোট ছোট পরিবর্তন আনা। এই পরিবর্তনগুলির কয়েকটি হল:
  • নিয়মিত ঘুম
  • নিয়মিত আহার
  • নিয়মিত শরীরচর্চা
  • মাথাব্যথা শুরু করতে পারে এমন সব কিছু কে এড়িয়ে চলা
  • চাপ নিয়ন্ত্রণ
  • ওজন হ্রাস করা (যদি প্রয়োজন হয়)
  • ক্যাফিন পরিহার